ইতিহাস ও ঐতিহ্য

রাজশাহী কলেজ ই-আর্কাইভ থেকে

প্রাচীন নগরী রাজশাহী। পদ্মাবিধৌত এই নগরী শিক্ষানগরী হিসেবে খ্যাত। পূর্বে এই নগরী পরিচিত ছিল মহাকলগড় নামে। পরবর্তীকালে রামপুর বোয়ালিয়া নামে এটি পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশের অন্যান্য অনেক অঞ্চলের মত রাজশাহীতেও ইসলাম প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে সুফি সাধকগণের। রাজশাহী নগরীর পদ্মাতীরে দরগাহপাড়া নামক স্থানে ত্রয়োদশ শতকে দুইজন ও ষোড়শ শতকে আরো একজন আগমনকারী সম্মানিত সুফি সাধকের মাযার রয়েছে। তাঁরা রাজশাহীতে আগমন করেছিলেন ইসলাম প্রচার ও ইসলামের শিক্ষাকে এতদঞ্চলের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে। তাঁরা হলেন হযরত তুরকান শাহ (রহ.), হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এবং হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর বংশধর হযরত শাহ নূর (রহ.)। হযরত শাহ নূর (রহ.) এর মাযার হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর মাযারের পাশেই রয়েছে। রামপুরের রাম শব্দটি বলাবাহুল্য হিন্দুদের রাম থেকে উদ্ভুত। বোয়ালিয়া শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ফারসি ‘বু’ ও আরবি ‘আউলিয়া’ শব্দ থেকে। এর অর্থ আউলিয়ার সুবাস। সুফি সাধকগণের আগমনের পরই এ নামে এ অঞ্চলটি খ্যাতি লাভ করেছিল তা বলাই যায়। নামকরণের ধরন থেকে অনুমিত হয়, মুসলমানদের আগমনের পর রাজশাহী নামকরণের পূর্ব থেকেই এখানকার হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠী ধর্মীয় উদারতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে এসেছে। বোয়ালিয়া রামপুর থেকে রাজশাহী নামকরণের ইতিহাস খুব স্পষ্ট নয়। কালীপ্রসন্ন বন্দোপাধ্যায় ইষড়পশসধহ এর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন, রাজা গণেশের সময় (১৪১৪-১৪১৮ খ্রিস্টাব্দ) রাজশাহী নামের উদ্ভব হয়েছে। তিনি ‘রাজশাহ’ নামে পরিচিত ছিলেন তাই সম্ভবত এই নামকরণ হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মতামত দিয়েছেন। তবে মনে করা যায় নাএ কথা সঠিক। কারণ, পরবর্তীতে রচিত আইন-ই-আকবরীতে কোথাও রাজশাহীর নাম উল্লেখ পাওয়া যায় না। বরং এ প্রসঙ্গে কাজী মেছের আলীর মতামতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছেন, মুর্শিদকুলি খান স¤্রাট আওরঙ্গজেবকে খুশি করার অভিপ্রায়ে হিন্দু রাজা ও মুসলমানদের বাদশাহী শব্দযোগে রাজার রাজ এবং বাদশাহীর শাহী একত্র করে রাজশাহী নামকরণ করেছিলেন। তবে এমনও হতে পারে, হযরত তুরকান শাহ (রহ.) এবং হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর নামের প্রারম্ভে শাহ শব্দটি রাজার নামের শেষে যুক্ত করে রাজশাহী হয়েছে। সমকালীন সমাজব্যবস্থায় হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর জনপ্রিয়তার কথা বিবেচনা করে এ ধরনের ধারণা অসঙ্গত হবে না। পরবর্তীতে এ অঞ্চল এই নামেই প্রতিষ্ঠিত ও বিকশিত হতে থাকে।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড হলে শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির মেরুদন্ড গঠনের প্রধানতম হাতিয়ার। স্থান ও সময়ের ভিন্নতায় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ, রুচি ও আবেগ ভিন্নতর হতে পারে। রাজশাহী নগরীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাস পূর্ব থেকেই প্রসিদ্ধ হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে রাজশাহীর অংশগ্রহণ ইর্ষণীয় ও ঐতিহ্যমন্ডিত। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলা বিজয়ের পর পরই ঘোষণা দিয়েছিলেন, যেন তাঁর আমীরগণ বিজীত অঞ্চলের রাজধানী শহর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থানে মসজিদ, মাদরাসা ও সুফি খানকাহ নির্মাণ করা হয়। এ সময়ের পর থেকে ধারাবহিকভাবে বাংলার বিভিন্ন শহরে নগরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই বর্তমানে নিশ্চিহ্নপ্রায়। এ সময়ে রাজশাহী শহরেও হয়তো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। কারণ ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের অর্ধশতক বছরের মধ্যেই রাজশাহীতে হযরত তুরকান শাহ এবং হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর আগমন ঘটেছিল। হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর ইসলাম প্রচারের অবস্থান ছিল রাজশাহী নগরেই। এ ছাড়াও রাজশাহীর অদূরে সে সময়ের বেশকিছু শিক্ষাকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করা যায়। যেমন দরসবারি মাদরাসা, মাহিসন্তোষ মাদরাসা, সুলতানগঞ্জ মাদরাসা, বাঘা মাদরাসা প্রভৃতি। এ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুফি-সাধক, আলিম উলামার সহযোগিতা এবং সমকালীন শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার কথাও উল্লেখযোগ্য। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে রাজশাহীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম তেমনভাবে জানা যায় না। তবে প্রাচীনকালের অন্যান্য অঞ্চলের মতই রাজশাহীতে শিক্ষাকেন্দ্র ছিল এবং উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাও ছিল উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজশাহীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের দেশব্যাপী অবদান ও ভূমিকায় ধীরে ধীরে রাজশাহী শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বর্তমানে রাজশাহীর লোকসংখ্যা যেমন বেড়েছে এই শহরের পরিধিও বেড়েছে অনেক গূণ। রাজশাহী বর্তমানে নগরী থেকে মহানগরীর রূপ ধারণ করেছে। উচ্চ শিক্ষায় বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী পরিচিতি পেয়েছে একটি ভিন্নমাত্রায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বর্তমানে রাজশাহীর সরকারি-বেসরকারি সাধারণ, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি সাধারণ ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ শিক্ষা প্রদান করা হচ্ছে। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা দেশে বিদেশে সম্মান ও গৌরবের সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

রাজশাহী কলেজ বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে অগ্রগণ্য পথিকৃত কলেজ হিসেবে স্বীকৃত। রাজশাহী কলেজের কারণেই রাজশাহী নগরী একসময়ে বিখ্যাত নগরী হিসেবে অবিভক্ত ভারতবর্ষে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিল। অধ্যাপক আবু হেনা Reaction and Reconcilment নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন যে, রাজশাহীর গর্ব করার মত উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে রাজশাহী কলেজ। রাজশাহী নগরী শিক্ষানগরী হয়ে ওঠার পেছনে রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠা ছিল অন্যতম পরিপ্রেক্ষিত। তবে শুরুটা হয়েছিল ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনেকটাই সংশ্লিষ্ট। রাজশাহীতে কর্মরত ইংরেজ কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুবন্দোবস্ত ও এতদঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতেই রাজশাহী কলেজের প্রতিষ্ঠা। পরবর্তীতে ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম এ্যাডামের সুপারিশক্রমে এই স্কুলটি সরকারি হিসেবে ঘোষিত হয় এবং এর নামকরণ হয় রাজশাহী জেলা স্কুল। এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন বাবু সারদা প্রসাদ বসু। মূলত রাজশাহী জেলা স্কুলের ভবনে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। এর পূর্বে রাজশাহীতে কোনো কলেজ স্থাপনের প্রচেষ্টার কথা জানা যায় না। রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠায় দুবলহাটির জমিদার হরনাথ রায়ের বিশেষ অবদান রয়েছে। তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠায় সে সময়ে জমিদারীর একটি সম্পত্তি দান করেন যার বাৎসরিক আয় ছিল পাঁচ হাজার টাকা। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১ এপ্রিল তৎকালীন রাজশাহী জেলা স্কুল ভবনে (বর্তমান রাজশাহী সরকারি কলেজিয়েট স্কুল) ফার্স্ট আর্টস (এফএ) ক্লাস শুরু হয়। এ সময় এ কলেজটিকে দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজের মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। কলেজটি প্রতিষ্ঠার পরপরই তৎকালীন সরকার কলেজটি উচ্ছেদের পরিকল্পনা গ্রহণ করে, কিন্তু রাজশাহী এসোসিয়েশনের চেষ্টা ও সাহায্য সহযোগিতায় উচ্ছেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে পারেনি। বরং কলেজটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। দিঘাপাতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রাজশাহী কলেজকে প্রথম শ্রেণির কলেজ হিসেবে উন্নীত করার ইচ্ছায় ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়নে দান করেন এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা। সময়োচিত এ বিশাল অবদান রাজশাহী কলেজকে প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে এই কলেজে বিএ ক্লাস চালু করা হয় এবং একই বছরে কলেজটিকে নিজস্ব আবাসভূমিতে স্থানান্তর করে নামকরণ করা হয় রাজশাহী কলেজ নামে। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে এই কলেজে এমএ এবং আইন ক্লাস চালু করা হয়১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তীকালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম অনুযায়ী কলেজ থেকে এমএ ও ল ক্লাস বিলুপ্ত করা হয়।

রাজশাহী কলেজের ভবন নির্মাণ, কলেজ হোস্টেল নির্মাণসহ অন্যান্য উন্নয়নের জন্য রাজশাহীর তৎকালীন জমিদার ও রাজাদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের মধ্যে দুবলহাটির জমিদার হরনাথ রায় চৌধুরী, দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়, রাজা প্রমোদ রায় ও বসন্ত রায়, পুঠিয়ার রানী শরৎসুন্দরী দেবী ও হেমন্তকুমারী দেবী, বলিহারের কুমার শরবিন্দু রায়, খান বাহাদুর এমাদউদ্দীন আহমেদ, কিমিয়া-ই- সাদাত এর অনুবাদক মীর্যা মো. ইউসুফ আলী, হাজী লাল মোহাম্মদ, নাটোরের জমিদার পরিবারের খান বাহাদুর রশিদ খান চৌধুরী, খান বাহাদুর এরশাদ আলী খান চৌধুরী ও বঙ্গীয় আইন পরিষদের ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার আশরাফ আলী খান চৌধুরী ছিলেন বিশেষভাবে স্মরণীয়। স্থানীয় অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের অনেকেই রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের থাকা খাওয়ার সুবিধা প্রদান করেছেন। তাঁদের মধ্যে নাটোরের খান চৌধুরী জমিদার পরিবার রাজশাহী শহরের হেতেম খাঁ এলাকায় তাঁদের পারিবারিক বাসস্থান “চৌধুরী লজ”-এ প্রায় বিশজন ছাত্রের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তদানীন্তন পশ্চাৎপদ মুসলমান সমাজের শিক্ষার উন্নয়নে তাদের এই উৎসাহ ছিল প্রেরণাদায়ক। একটি প্রথম শ্রেণির প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজশাহী কলেজ শুরু থেকেই দ্রæত প্রসিদ্ধি লাভ করতে থাকে।

রাজশাহী কলেজ কম্পাউন্ড বৃদ্ধিতে কলেজ সংলগ্ন হযরত শাহ্ মখদুম রূপোশ (রহ:) এর মাযার কর্তৃপক্ষের আন্তরিক উদারতা ও সহযোগিতা ছিল। ‘হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ:) ওয়াকফ এস্টেট’ রাজশাহী কলেজকে প্রায় চার একর জমি দান করে।

প্রখ্যাত দানবীর হাজী মুহম্মদ মহসীন-এর আর্থিক অনুদানে ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী কলেজ প্রশাসনের তত্বাবধানে রাজশাহী জুনিয়র মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১২-১৩ খ্রিস্টাব্দে অধ্যক্ষ রায় কুমুদিনী কান্ত ব্যানার্জি বাহাদুর প্রদত্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, কলেজের সংযুক্ত প্রতিষ্ঠান রূপে একটি জুনিয়র মাদরাসা চার জন মৌলভি ও একজন ইংরেজি শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ফি ছাড়া সংস্কৃত বিষয়ে শিক্ষাদানের জন্য কলেজ প্রশাসনের অধীনে মহারানী হেমন্তকুমারী সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে দিঘাপতিয়ার রাজা বসন্ত কুমার রায়ের আর্থিক সহায়তায় রাজশাহী কলেজ প্রশাসনের অধীনে বসন্ত কুমার এগ্রিকালচারাল ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে রাজশাহী কলেজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্ত¡াবধানে পরিচালিত তিনটি প্রতিষ্ঠান রাজশাহী মাদ্রাসা, মহারানী হেমন্ত কুমারী সংস্কৃত কলেজ এবং বসন্ত কুমার এগ্রিকালচারাল ইন্সটিটিউট রাজশাহী কলেজকে বৃহৎ পরিসরের কলেজ কিংবা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ প্রদান করে।১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত বিভক্তির পর পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে রাজশাহী কলেজ প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং পরে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলে প্রায় শতবর্ষী প্রাচীন রাজশাহী কলেজ পূর্ববর্তী দুটি যুগ পেরিয়ে স্বাধীন যুগে প্রবেশ করে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ¯œাতক পাশ ও ¯œাতক সম্মান কোর্স রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত থাকার পর ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে স্নাতক পর্যায়ের কোর্সগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভূক্ত হয়। বর্তমানে ২৩ টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও ২৪ টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু রয়েছে।

যে সকল প্রথিতযশা শিক্ষাবিদের অবদানে রাজশাহী কলেজের ঐতিহ্য সমুন্নত হয়েছে তাঁদের মধ্যে শ্রীকুমার ব্যানার্জী, সুনীতি কুমার ভট্টাচার্য, ড.পি.ভি শাস্ত্রী, রায় কুমু.দিনী কান্ত ব্যানার্জি বাহাদুর, ড. কুদরত ই-খুদা, হুমায়ুন কবির (সাহিত্যিক-রাজনীতিক), আবু হেনা, সৌরেন মজুমদার, ক্ষেমেশচন্দ্র দে, স্নেহময় দত্ত, বি.সি. কুন্ড, শিব প্রসন্ন লাহেড়ী, ড. এনামুল হক, ড. গোলাম মকসুদ হিলালী, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, ড. এ আর মল্লিক, এম. শামস্ উল হক (প্রাত্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী), ড. আব্দুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দীন, ড. এম. এ. বারী, ড. কাজী আব্দুল মান্নান, ড. আবুহেনা মোস্তফা কামাল, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

অধ্যক্ষ হিসেবে যে সকল প্রথিতযশা পÐিত ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করে গেছেন তাঁর মধ্যে ০৭ জন বৃটিশ নাগরিকসহ অন্যতম মি. হরগোবিন্দ সেন, রায় কুমুদিনী কান্ত ব্যানার্জি বাহাদুর, মি. এস.এন. মৈত্র, মি. এ.কে. মুখার্জী, ড. পি.ডি. শাস্ত্রী, মি. জে.এম. বোস, ড. এস.কে. ব্যানার্জী, ড. ¯েœহময় দত্ত, ড. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, ড. আই,এইচ, জুবেরী, এম. তাহের জামিল, এ. করিম মÐল, এ. মুনেম , সলমন চৌধুরী, প্রফেসর ড. আবদুল হক, প্রফেসর এম.এ. হাই প্রমুখ। বর্তমানে (২০২০ খ্রি.) কলেজের অধ্যক্ষ এবং উপাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন যথাক্রমে প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান ও প্রফেসর মোহা. আব্দুল খালেক। অসংখ্য কৃতি শিক্ষার্থী রাজশাহী কলেজ থেকে শিক্ষালাভ করে পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিমান হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শ্রী রাধিকা মোহন মৈত্র, প্রমথনাথ বিশী, স্যার যদুনাথ সরকার, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, কবি রজনী কান্ত সেন, কাজী মোতাহার হোসেন, খান বাহাদুর এমাদউদ্দীন আহমেদ, জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান, মীর্জা গোলাম হাফিজ, ড. কাজী আব্দুল মান্নান, ড. মযহারুল ইসলাম, ড. এম.আর. সরকার, ড. এম.এ. রকীব, মাদারবক্স, ডা. গোলাম মওলা, বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ঋত্বিক ঘটক (প্রখ্যাত চলচিত্রকার), এ কে খন্দকার (মুক্তি বাহিনীর উপ-সর্বধিনায়ক) আনোয়ার পাশা, ড. এবনে গোলাম সামাদ, ড. এমাজউদ্দীন আহমদ (সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ড. ওয়াজেদ আলী মিয়া (পরমাণু বিজ্ঞানী), নাজমা জেসমিন চৌধুরী, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক প্রফেসর হাসান আজিজুল হক, প্রফেসর ড. আব্দুল খালেক (প্রাক্তন উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়), নাট্যকার মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, প্রাক্তন শিক্ষা সচিব কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদ, প্রফেসর সনৎ কুমার সাহা (প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও রবীন্দ্র গবেষক) এমিরেটাস প্রফেসর অরুণ কুমার বসাক (পদার্থ বিজ্ঞানী) অন্যতম। কলেজ ভবন সংক্রান্ত বিষয়ে পূর্বেও কিছু উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠার শুরুতে রাজশাহী কলেজের কোন নিজস্ব ভবন ছিল না। রাজশাহী এসোসিয়েশন এর নেতৃবৃন্দ কলেজের প্রথম ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। একজন ইংরেজ প্রকৌশলীর পরিকল্পনায় ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে একষট্টি হাজার সাতশ টাকা ব্যয়ে বর্তমান প্রশাসন ভবনটি নির্মিত হয়। গাঢ় লাল বর্ণের দোতলা ভবনটি কালের গ্রাস জয় করে নগরীর প্রধান ও প্রাচীনতম সড়কের পাশে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর পর একে একে নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, শিক্ষকদের আবাসস্থল, অধ্যক্ষের বাসভবন। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজশাহী কলেজে গড়ে উঠেছে পাঁচটি বিজ্ঞান ভবন, দুইটি কলাভবন, ইংরেজি বিভাগের জন্য একটি পৃথক ভবন; পুকুরের পশ্চিম পাড়ে ‘গ্যালারি ভবন’। এই ভবনটি প্রখ্যাত দানবীর হাজী মুহম্মদ মহসীন ভবন নামে পরিচিত। ১৯০৯ সালে নির্মিত হয় কলেজের অন্যতম একটি সুন্দর স্থাপনা ‘মোহামেডান ফুলার হোস্টেল’। যেখানে বর্তমানে ৭টি বিভাগ ও সেমিনার কক্ষ অবস্থিত। দৃষ্টি নন্দন পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে নির্মিত হয়েছে শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান ভবন।এছাড়াও কলেজের সম্মুখ চত্বরে আছে একটি শহীদ মিনার এবং শহীদ মিনারের পশ্চিমে লাইব্রেরি ও অডিটোরিয়াম ভবন। খরস্রোতা পদ্মা নদীর উত্তরে হযরত শাহ মখদুম (রহ.) এর মাজার-এর পূর্ব পাশে নির্মিত হয় অধ্যক্ষের দোতলা বাসভবন। এই ভবনটিতে উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদগণ বসবাস করে গেছেন। কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মহোদয়ও এখানে বসবাস করছেন। ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ভবনটি এখনও স্বমহিমায় অক্ষত রয়েছে। অধ্যক্ষের বাসভবনের পূর্বপ্রান্তে শিক্ষকদের জন্য রয়েছে দুটি তিন তলা আবাসিক ভবন। ছাত্রদের জন্য বিভাগপূর্ব (১৯৪৭ এর পূর্বে) কালে ছয়টি বøক নিয়ে একটি ছাত্রাবাস নির্মিত হয়। বিভাগোত্তর কালে এই ছাত্রাবাসের আরেকটি বøক নির্মিত হয়। কলেজের উত্তর দিকে দুটি ছাত্রীনিবাস নির্মিত হয়েছে।

রাজশাহী কলেজে পরীক্ষার ফলাফল বরাবরের মত বর্তমানেও অনেক ভাল। শিক্ষাবোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় ছাত্র-ছাত্রীদের সাফল্য কলেজের উন্নত শিক্ষামানের সাক্ষ্য বহন করে। উল্লেখ্য, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত তদানীন্তন পূর্ববাংলায় একমাত্র রাজশাহী কলেজেই স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে পাঠদান করা হতো। সে সময় অবিভক্ত বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়াও আসাম, বিহার ও উড়িষ্যা থেকে শিক্ষার্থীরা এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের জন্য আসতেন। শতাব্দী প্রাচীন এ প্রতিষ্ঠানটি কেবলমাত্র শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং পÐিত ও গবেষকদের জন্য এক অনন্য গবেষণাক্ষেত্র হিসাবেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। গবেষক ড. মো. মনজুর কাদির ভারতের নর্থবেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে রাজশাহী কলেজের ওপর ÒProgress of Higher Education in Colonial Bengal and After: A Case Study of Rajshahi College (1873-1973)” (১৮৭৩-১৯৭৩)”শিরোনামে গবেষণাকর্ম সম্পাদন করে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তিনি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে রাজশাহী কলেজে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন, এখন রাজশাহীতেই অবসর জীবনযাপন করছেন। এ ছাড়াও বর্তমানে বেশ কয়েকজন গবেষক শিক্ষা বিস্তারে রাজশাহী কলেজের ভূমিকা প্রসঙ্গে গবেষণারত আছেন।

বর্তমান রাজশাহী কলেজ পঁয়ত্রিশ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর রয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন ও মনোমুগ্ধকর ক্যাম্পাস। সামনে তাকালে যেখানেই ফাঁকা জায়গা সেখানেই একটি ফুলের বাগান। ধুমপান ও মাদকমুক্ত এই ক্যাম্পাস গ্রীন ক্যাম্পাস ও ক্লিন ক্যাম্পাস নামে পরিচিত। পঁয়ত্রিশ একর পরিসীমার এ কলেজ ক্যাম্পাসে রয়েছে দৃষ্টি নন্দন বিভিন্ন ভবন, শহীদ মিনার, রাজশাহীর সর্বোচ্চ বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, রবীন্দ্র-নজরুল চত্বর, পাড় বাঁধানো একটি পুকুর, সুদৃশ্য মসজিদ, মন্দির এবং দুটি খেলার মাঠ। ক্যাম্পাসটি নানান বিরল প্রজাতির বৃক্ষ দ্বারা শোভিত। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত ঐতিহ্য ভবন খ্যাত একটি দ্বিতল প্রশাসন ভবনসহ ১২টি একাডেমিক ভবন রয়েছে।

এগুলো হলো, প্রশাসনিক ভবন, হাজী মুহম্মদ মহসীন ভবন, ফুলার ভবন, পদার্থবিজ্ঞান ভবন, প্রথম বিজ্ঞান ভবন, দ্বিতীয় বিজ্ঞান ভবন, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ভবন, শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান একাডেমিক কাম এক্সামিনেশন ভবন, কলা ভবন ইংরেজি ভবন এবং রসায়ন ভবন। সুপরিসর কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিসহ ২৩টি বিভাগের ২৩টি সেমিনার লাইব্রেরি এই কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগকে বিস্তৃত করেছে। বর্তমানে কলেজ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য হস্ত লিখিত পুঁথি, পুস্তক, সাময়িকীসহ ২,৫৬,৫২০ (দুই লক্ষ ছাপান্ন হাজার পাঁচশত বিশ) খানা বই রয়েছে এই কলেজের লাইব্রেরিতে।

এই কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ছাব্বিশ হাজার। শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুপাতে হোস্টেলের এবং হোস্টেলের আসনের সংখ্যা একেবারেই সীমিত। এখানে দুটি ছাত্রদের এবং দুটি ছাত্রীদের হোস্টেল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হলো মুসলিম ছাত্রাবাস যেটিতে আটটি বøক রয়েছে। এখানে আসন সংখ্যা হলো পাঁচশত পঞ্চাশটি। মহারানী হেমন্তকুমারী হিন্দু হোস্টেলে রয়েলে তেপ্পান্নটি আসন, রাজশাহী কলেজ ছাত্রীনিবাসে রয়েছে তিনশত আটাত্তরটি এবং রহমতুন্নেছা ছাত্রীনিবাসে মোট আসন সংখ্যা একশত চৌষট্টিটি। সবমিলিয়ে হলো একহাজার একশত পঁয়তাল্লিশটি আসন। এই কলেজে আরো রয়েছে একটি চিকিৎসা কেন্দ্র যেখানে একজন চিকিৎসক স্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত রয়েছেন। আরো আছে একটি পুলিশ স্টেশন ও একটি ক্যান্টিন।

শিক্ষকগণের আবাসনের সুবিধার্থে তিন তলাবিশিষ্ট ২টি ডরমেটরি রয়েছে। বিজ্ঞান ল্যাব রয়েছে তেইশটি, আইসিটি ল্যাব পাঁচটি এবং বারটি বিশেষায়িত সহ মোট একানব্বইটি ক্লাসরুম রয়েছে যার সবগুলোই মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সুবিধাসমৃদ্ধ। পুকুরপাড়টি সম্প্রতি দৃষ্টিনন্দন লাল টাইলস দিয়ে বাঁধানো হয়েছে। শানবাধানো পুকুরঘাটে নৌকা বাঁধা। এরই মধ্যে একটি বক ঘাড় উঁচু করে তাকিয়েরয়েছে। শাপলা ফুল আর পাতায় সমস্ত পুকুর ভরভরন্ত।এর চারপাশের ভূমিতে বিস্তৃত ফুলবাগানের ফাঁকে ফাঁকে হরিণ, বাঘ ইত্যাদির ভাস্কর্য রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মাঠের কয়েকটি স্থানে ফুলের বাগান নির্মাণ করা হয়েছে। অধ্যক্ষের বাসভবন ও বিভাগের ভবনসমূহের মধ্যবর্তী সুবিশাল ও দৃষ্টিনন্দন আয়তাকার খেলার মাঠ দুইটি রাজশাহী মহানগরীর এক অন্যতম আকর্ষণ। এ মাঠে অনুশীলনকারী অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় হিসেবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন এবং বর্তমানে ফুটবল ও ক্রিকেটে ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবসহ জাতীয় এবং প্রিমিয়ার লীগে নিয়মিত খেলোয়াড হিসেবে তারা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে। বিশ্বক্রীড়ার সর্ববৃহৎ আসর ১৯৮৪ সালে লসএঞ্জেলস অলিম্পিক এর মাঠে প্রথমবারের মত বাংলাদেশের পতাকা বহন করেন রাজশাহী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং দেশের দ্রæততম মানব সাইদুর রহমান ডন। উল্লেখ্য যে, রাজশাহী কলেজে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আগমন ঘটেছিল। তিনি রাজশাহী কলেজের সে সময়ের শিক্ষার্থীদের সাথে তিন রাত্রি যাপন করেছিলেন। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের শহীদ মিনারটি প্রথম নির্মিত হয়েছিল রাজশাহী কলেজেই।

স্বাধীনতা উত্তরকাল হতে বর্তমান পর্যন্ত রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক ফলাফলের ভিত্তিতে রাজশাহী কলেজের অবস্থান শীর্ষেই ছিল। এমনকি সারাদেশে সরকারি কলেজসমূহের মধ্যে রাজশাহী কলেজ ফলাফলের দিক থেকে তার শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং-এ সারাদেশের কলেজসমূহের মধ্যে ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে। এছাড়াও জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে বাংলাদেশে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের জন্য বিবেচিত হয় এবং শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে মহামান্য প্রেসিডেন্ট এডভোকেট আবদুল হামিদের নিকট থেকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার লাভ করে। এ ছাড়াও এবং মানসম্পন্ন শিক্ষা সরকারি কলেজ অধ্যক্ষ সম্মেলন-২০১৭ এ সরকারি কলেজের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে মানসম্মত শিক্ষার সেরা প্রতিষ্ঠান তথা মডেল কলেজ হিসেবে রাজশাহী কলেজ বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে পুরস্কার লাভ করে।

রাজশাহী কলেজকে অনন্য অবদানের জন্য বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান জাতীয় পর্যায়ে পাঁচটি পুরস্কার লাভ করেছেন। যা প্রমাণ করে বর্তমান রাজশাহী কলেজ শিক্ষাক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে চলেছে।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মুক্ত বুদ্ধির চর্চা, জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞান বিতরণের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য প্রতিটি বিভাগ প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের একক বা যৌথভাবে সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম, অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। একাডেমিক শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ সাড়ম্বরেই পরিচালিত হয়ে থাকে এই কলেজে। কলেজের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দিক থেকে পারদর্শী করার জন্য সাতাইশটি বিশেষ সংগঠন তৈরি করা হয়েছে, এগুলো কলেজের শিক্ষকগণের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে থাকে। রাজশাহী কলেজ বর্তমান বাংলাদেশে পরিচিত শিক্ষাবান্ধব বিদ্যাপীঠ হিসেবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ঘোষিত র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের সরকারি কলেজগুলোর মধ্যে পরপর চারবার প্রথম স্থান অর্জন করে ইতোমধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসন অলঙ্কৃত ও প্রতিষ্ঠিত করেছে। কলেজের প্রতিটি বিভাগ ফলাফলের দিক থেকে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে চলেছে। কলেজের সৌন্দর্য, পরিচ্ছন্নতা, খাবার পানির সুবিধা, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস যে কোনো দর্শক-পর্যটককে মুগ্ধ করে। ভাবতেই ভালো লাগে দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র একটি দেশের অবহেলিত এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র একটি শিক্ষালয় ধীরে ধীরে কী প্রকান্ড মহিরুহ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়েছে! মেধা, পরিশ্রম, সততা, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সুন্দর বাস্তবায়নের মাধ্যমে যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এইভাবে সুন্দর একটি বিদ্যাপীঠে পরিণত করা সম্ভব রাজশাহীর কলেজ এর সুন্দর দৃষ্টান্ত।


তথ্যসূত্র

  • কালীপ্রসন্ন বন্দোপাধ্যায়, বাঙ্গালার ইতিহাস (নবাবী আমল) ২য় সংস্করণ (কলিকাতা: ১৩১৫ বঙ্গাব্দ) পৃ. ৬৫; খান বাহাদুর আবদুল হাকিম সম্পাদিত, বাংলা বিশ্বকোষ, চতুর্থ খÐ (ঢাকা: নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৭৬), পৃ. ২৪৯।
  • কাজী মোহাম্মদ মিছের, রাজশাহীর ইতিহাস, ১ম খÐ (বগুড়া: কাজী প্রকাশন, ১৯৬৫), পৃ. ২৫৯ (পাদটীকা)
  • মিনহাজ-ই-সিরাজ, তবকাত-ই-নাসিরী (আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া অনূদিত ও সম্পাদিত), (ঢাকা: দিব্য প্রকাশ, ২০০৭), পৃ. ২৭।
  • নূরুল ইসলাম খান (সম্পা.), “শিক্ষা ব্যবস্থা”, বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার, বৃহত্তর রাজশাহী (ঢাকা: বাংলাদেশ সরকারী মুদ্রণালয়, ১৯৯১), পৃ. ২৮৫-২৮৬; মাওলানা আহমাদুল্লাহ, “ইসলামী শিক্ষা বনাম রাজশাহী শিক্ষানগরী” জামেয়া শাহমখদুম স্মরণিকা ২০১৬, রাজশাহী: জামেয়া ইসলামিয়া শাহ মখদুম মাদরাসা, ২০১৬, পৃ. ২৭-২৯।
  • বাউলিয়া ইংলিশ স্কুলটিকে এসএম আবদুল লতিফ তাঁর গ্রন্থে বুয়ালিয়া ইংলিশ স্কুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দ্র. এসএম আবদুল লতিফ, ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজ ও রাজশাহী সিটি কলেজ (রাজশাহী: রাজশাহী এসোসিয়েশন, ২০১২), পৃ. ১৬।
  • ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্কুলটি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিত। দ্র. রাজশাহী কলেজ প্রসপেক্টাস, ২০১৬; শ্রীকালীনাথ চৌধুরী, রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং রাজশাহী পরিচিত (ঢাকা: গতিধারা প্রকাশনী, ২০১৪), পৃ. ৩৬৬-৩৬৭।
  • মুহাম্মদ আবদুস সামাদ, সুবর্ণ দিনের বিবর্ণ স্মৃতি, (রাজশাহী: উত্তরা সাহিত্য মজলিশ, ১৯৮৭), পৃ. ৮০।
  • শ্রীকালীনাথ চৌধুরী, রাজশাহীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং রাজশাহী পরিচিত (ঢাকা: গতিধারা প্রকাশনী, ২০১৪), পৃ. ৩৬৭।
  • ড. মো. মনজুর কাদির, “রাজশাহী কলেজের অতীত ইতিহাস”, রাজশাহী মহানগরী : অতীত ও বর্তমান, ১ম খÐ, রাজশাহী: ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী সিটি কর্পোারেশন, পৃ. ৬৩৮-৬৪৪; রাজশাহী কলেজ প্রসপেক্টাস ২০১৬।

লেখক