ব্যবস্থাপনা বিভাগের ইতিহাস

রাজশাহী কলেজ ই-আর্কাইভ থেকে

ব্যবস্থাপনা বিভাগ পরিচিতি বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশে আমাদের শিল্প ব্যবসায় বাণিজ্য বিনষ্ট করেছে, পাশাপাশি তারা এ দেশে বাণিজ্য শিক্ষার কোনো প্রকার পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। রাজশাহী কলেজে যখন বহু বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু ছিলো তখন এখানে বাণিজ্য শিক্ষার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, ইসলামিয়া কলেজ ও রাজশাহী কলেজে বা অন্য কোনো সরকারী কলেজে বাণিজ্য শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল না। মূলতঃ এটা বৃটিশ সরকারের একটা ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। অনার্স পড়া তো দূরের কথা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েও বাণিজ্য পাঠ্য বিষয় হিসেবে ছিল না। রাজশাহী কলেজে বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয় ১৯৫২ সালে। ১৯৫২ সালে আই.কম ক্লাস শুরু হলে ১৯৫৪ সালে আই.কম পরীক্ষায় যারা পাশ করে তাদের নিয়ে ১৯৫৪ তেই রাজশাহী কলেজে বি.কম খোলা হয়। সরকারি কলেজগুলোর মধ্যে রাজশাহী কলেজই প্রথম যেখানে এত দ্রæত বি.কম খোলা হয়। এতদঞ্চলে বাণিজ্য শিক্ষার দ্রæত সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে রাজশাহী কলেজ বিশেষ কৃতিত্বের দাবীদার। ১৯৫২ সালে বাণিজ্য বিভাগ খোলা হলে এখানে শিক্ষক হয়ে আসেন প্রফেসর আজমত উল্লাহ ও প্রফেসর আজগর আলী তালুকদার। এঁরা দু’জনেই প্রথম রাজশাহী কলেজে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষক হবার গৌরব লাভ করেন। রাজশাহী কলেজের ১৯৫৪ সালের শিক্ষক তালিকায় এঁদের নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে (উবঢ়ধৎঃসবহঃ ড়ভ ঈড়সসবৎপব: ১. গার অুসড়ঃ টষষধয, ২. গার, অংমধৎ অষর ঞধষঁশফবৎ.) প্রফেসর আজগর আলী তালুকদার একটি প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাজ্য চলে গেলে জনাব নুরুন্নবী (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত আয়কর উকিল) শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ১৯৫৪ সালে। পরবর্তীতে ১৯৬১-৬২ সালে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় অনার্স খোলা ও পাঠদান সংক্রান্ত রুলস এন্ড রেগুলেশন প্রণয়ন করে। যতদুর জানা যায় সে বছরই রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে রাজশাহী কলেজে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয় এবং ০৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় অনার্স পাঠদান কার্যক্রম। তবে তদানীন্তন সময়ে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের বিষয়সমূহ কলা অনুষদের আওতায় নিয়ন্ত্রিত হতো বিধায় রাজশাহী কলেজের অনার্স কোর্সও সেই অনুষদের অধীন ছিলো। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য অনুষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন রাজশাহী কলেজ ব্যবস্থাপনা বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের আওতায় পরিচালিত হয়। রাজশাহী কলেজে ১৯৬১-৬২ সালে অনার্স চালু হওয়ার পর বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে কে ছিলেন তা সঠিক জানা যায়নি। যাহোক পরবর্তীকালে ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান হন অধ্যাপক সত্যবান দাস। আরও পরে ১৯৭৪ সালে অধ্যাপক আব্দুর রহমান [এম.এ. (কম), কোলকাতা, ১৯৪৭] বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রধান পদে আসীন হন অধ্যাপক গাজী আব্দুস সালাম। অতএব অধ্যাপক আব্দুর রহমান সাহেব দীর্ঘ দিন বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনি বিশেষ যোগ্যতার সাথে বিভাগ পরিচালনা করেন। বিশেষ আনন্দের বিষয় হল যে, বাণিজ্য বিভাগের অফিস কক্ষ লাইব্রেরী, মিউজিয়ম সবই পড়েছিলো ব্যবস্থাপনা বিভাগের ভাগে। অর্থাৎ পূর্বের বাণিজ্য বিভাগ বর্তমানে ব্যবস্থাপনা বিভাগ। আর হিসাববিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হল উত্তর দিকের নতুন কক্ষে। বাণিজ্য বিভাগের পিওন জনাব আব্দুল মমিন মিঞা থেকে গেলেন ব্যবস্থাপনা বিভাগে। যাহোক, পরবর্তীকালেও বহু খ্যাতিমান শিক্ষক বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষকতা করে গেছেন। অধ্যাপক সত্যবান দাস, অধ্যাপক নাজির উদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক শাফায়াত আহমদ, অধ্যাপক আবদুর রহমান, প্রফেসর গাজী আবদুস সালাম, অধ্যাপক গোলাম মুর্তোজা, অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, প্রফেসর মো: শামসুদ্দীন খান প্রমুখ সুযোগ্য শিক্ষকগণ রাজশাহী কলেজের বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অধ্যাপক সত্যবান দাসের নামটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাণিজ্য বিভাগটিকে সাজিয়ে গুছিয়ে যুগোপযোগী করে তুলতে তিনি বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। বাণিজ্য বিভাগের একটি কক্ষে তিনি বিভাগীয় লাইব্রেরি এবং অন্য একটি কক্ষে মিউজিয়াম (গঁংবঁস) গড়ে তোলেন। মিউজিয়ামে বিভিন্ন ধরনের শিলা, মাটি ও কয়লা কাঁচের বৈয়মে সংরক্ষণ করেন। বিভিন্ন ধরনের ভৌগলিক ও বাণিজ্যিক ম্যাপ ও অত্যাধুনিক একটি ক্যামেরা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ছিল। শিক্ষকগণ বাণিজ্যিক ভূগোল ক্লাসে ঐ সব ম্যাপ নিয়ে ক্লাসে যেতেন এবং ভূগোলের শিক্ষক মাঝে মধ্যে ছাত্রদের নিয়ে মিউজিয়ামে প্রবেশ করতেন। অধ্যাপক সত্যবান দাস যুক্তরাষ্ট্র থেকে এম.বি.এ করেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় তখন রাজশাহী কলেজ কত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক পাঠদান করতেন। আজকের দিনে কলেজের অনেকে হয়তো শুনে অবাক হবেন যে রাজশাহী কলেজে কেবলমাত্র বাণিজ্য বিভাগেই নাইট শিফট চালু ছিল। রাতে শুধু আই.কম ও বি.কম পড়ানো হতো। রাতে চাকুরীয়া ছাত্রের সংখ্যাই বেশি ছিল। রাতের শিফট সে সময় চালু ছিল। পরে কখন নাইট শিফট বন্ধ হয়েছিল তার সঠিক কোনো তথ্য নেই। রাতের শিফটে যাঁরা ক্লাস নিতেন দিনে সাধারণতঃ তাঁদের ক্লাস থাকতো না। অধ্যাপক আব্দুর রহমান অবসরে গেলে প্রফেসর মো. শামসুদ্দীন খান বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অধ্যাপক মো. শামসুদ্দীন খানও দীর্ঘদিন বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। সদালপী, অমায়িক বিশিষ্ট ভদ্রলোক প্রফেসর শামসুদ্দীন খান দায়িত্ব ও নিষ্ঠার সাথে বিভাগ পরিচালনা করেন। রাজশাহী কলেজকে কেন্দ্র করে উত্তর অঞ্চলে বাণিজ্য শিক্ষার অগ্রযাত্রা শুরু। এই কলেজ থেকে বহু কৃতি ছাত্র বাণিজ্য শাখায় ভাল ফলাফল লাভ করেছে- যারা আজ দেশে এবং বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠত। সেদিনের বাণিজ্য বিভাগের কলেবর আজকের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাথে মিলবেনা। আজ বিভাগে মোট ছাত্র সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার আর শিক্ষকের পদ ১২টি। বর্তমানে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে আছে প্রফেসর ড. মো. সেরাজ উদ্দীন। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বে বিভাগের ভিশন-মিশন নির্ধারণপূর্বক একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আইসিটি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ করে গড়ে তোলে তাদের উজ্জ্বল ক্যারিয়ার বিনির্মাণের কাজ চলছে। এক্ষেত্রে বিভাগীয় সম্মানিত শিক্ষকগণের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো।