প্রশাসন ভবন

রাজশাহী কলেজ ই-আর্কাইভ থেকে

Shahadat Hossain (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ২২:২৯, ১৪ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (১টি সংশোধন আমদানি করা হয়েছে)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠা উত্তরবঙ্গের শিক্ষার ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায়। দেড় শতাধিক বছরের ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় স্থানীয় জমিদার, বিত্তবান ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গ বিশেষ করে রাজশাহী এসোসিয়েশনের সপ্রচেষ্ট উদ্যোগে। ১৮৭৩ সালে দুবলহাটির জমিদার রাজা হরনাথ রায় এবং দিঘাপাতিয়ার জমিদার রাজা প্রমদানাথ রায়ের আর্থিক সহায়তায় এ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও কলেজ প্রশাসন ভবনটি নির্মিত হয় ১৮৮৪ সনে।১ এ ভবন নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয় রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে। রাজশাহী এসোসিয়েশনের উদ্যোগে ও একজন ইংরেজ প্রকৌশলীর পরিকল্পনায় এবং পুঠিয়ার রাণী শরৎসুন্দরী দেবীর এককালীন দশ হাজার টাকার অনুদানে মোট ৬১,৭০৩ টাকা ব্যয়ে বর্তমান সুদৃশ্য ভবনটি নির্মিত হয়।২ ইমারতটি বাংলার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। দৃষ্টিনন্দন ও ঐতিহ্যবাহী এ ভবনের দ্বিতলের পূর্ব ব্লকে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের অফিস, মধ্য ব্লকে শিক্ষক মিলনায়তন, পশ্চিম ব্লকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও সভাকক্ষ বিদ্যমান। অন্যদিকে ভবনটির নীচতলা জুড়ে রয়েছে প্রশাসন, হিসাব, পরীক্ষা ও ক্যাশ শাখার কার্যালয় এবং পশ্চিম ব্লকে রয়েছে একটি ছাত্রী কমনরুম। পঁয়ত্রিশ একর জমির উপর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন মি. হরগোবিন্দ সেন (১৮৭৩-৭৮ খ্রি.)।৩ রাজশাহী কলেজের প্রশাসন ভবন হিসেবে ব্যবহৃত উত্তরমুখী এ ইমারতটি ইট, চুন-সুরকি, লোহা ও কাঠের উপকরণে নির্মিত এবং দ্বিতল বিশিষ্ট। ভবনটির ভূমি নকশা ইংরেজি বর্ণ ঐ আকৃতির ন্যায় নির্মিত। সমগ্র ইমারতটি মূলত মধ্যবর্তী, পূর্ব ও পশ্চিম এই তিনটি ব্লকে এবং উভয়তলায় দুটি বারান্দাসহ মোট এগারোটি কক্ষে (নিচতলায় সিঁড়িঘরসহ ৬টি ও দ্বিতলে ৫টি) বিভক্ত। মধ্যবর্তী ব্লক পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ ১৪.৭০দ্ধ৬.২০ মিটার আয়তনের একটি হলঘর এবং হলঘরের সম্মূখে ৩.৩৭দ্ধ১৪.৭০ মিটার আয়তনের একটি টানা বারান্দা সংবলিত। এই ব্লকের হলঘর ও বারান্দার সাথে সংযোজিত পশ্চিম ব্লকে দুটি এবং পূর্ব ব্লকে তিনটি কক্ষ রয়েছে। পূর্ব ব্লকের তিনটি কক্ষের মধ্যবর্তী কক্ষটি মূলত ১৪.৭০দ্ধ৬.২০ মিটার আয়তনের একটি সিঁড়িঘর। এ ঘরে দ্বিতলে উঠার সুপ্রশস্ত একটি কাঠের সিঁড়ি বিদ্যমান। হলঘরের বারান্দামুখী পাঁচটি, পূর্ব ব্লকের সিঁড়িঘরের সাথে একটি, পূর্ব-দক্ষিণ কোণের সাথে একটি এবং পশ্চিম ব্লকের দক্ষিণের কক্ষের সাথে দুটি দরজা এবং দক্ষিণ দেয়ালে পাঁচটি ভেনিসীয় খিলান বিশিষ্ট জানালা রয়েছে। অন্যদিকে হলঘরের সম্মুখস্থ বারান্দা পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার খিলানে উন্মুক্ত। বারান্দার পূর্বদিকে সিঁড়িঘরের সাথে একটি এবং পশ্চিমের দুটি কক্ষের সাথে একটি করে দরজা বিদ্যমান। পূর্ব ব্লকের সিঁড়িঘরটি উত্তর ও দক্ষিণের ৫.৬০দ্ধ৫.৬০ মিটার আয়তন বিশিষ্ট দুটি বর্গাকার কক্ষের সাথে দুটি করে দরজা দ্বারা সংযুক্ত। সিঁড়িঘরের পূর্ব দেয়ালে তিনটি, উত্তর দিকের কক্ষের পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে (পূর্ব দেয়ালের দক্ষিণের জানালাটি বন্ধ করে বর্তমানে শৌচাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে) এবং দক্ষিণের কক্ষের পূর্ব ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে ভেনিসীয় খিলান সংবলিত জানালা বিদ্যমান। পশ্চিম ব্লকের কক্ষ দুটির মধ্যে উত্তর দিকের কক্ষটি ৮.৩০দ্ধ৫.৬০ মিটার এবং দক্ষিণ দিকের কক্ষটি ১০.১০দ্ধ৫.৬০ মিটার আয়তন বিশিষ্ট। উত্তর দিকের কক্ষটির পূর্ব ও উত্তর দেয়ালে দুটি করে এবং পশ্চিম দেয়ালে তিনটি জানালা এবং দক্ষিণ দিকের কক্ষটির পশ্চিম দেয়ালে তিনটি ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে জানালা দৃশ্যমান। ভবনটির নীচতলার কক্ষ বিন্যাসের ন্যায় দ্বিতলের কক্ষসমূহও ঠিক একই আয়তনের ও সমসংখ্যক দরজা-জানালায় সন্নিবেশিত। তবে নীচতলার জানালাসমূহ সবই ভেনিসীয় খিলান সংবলিত এবং জানালাসমূহের উপর ঠেসযুক্ত কার্নিশ বিদ্যমান। অন্যদিকের দ্বিতলের জানালসমূহের মধ্যে কেবল হলঘরের দক্ষিণ দেয়ালের জানালাগুলো ভেনিসীয় খিলান সংবলিত এবং অন্যগুলো উল্লম্বাকারে ও তদুপরি ঢালু কার্নিশসহ (slanting cornice) লোহার নির্মিত পিস্তল আকৃতির ঠেসের উপর টিনের সানশেড নির্মিত। ভবনটির উভয়তলার প্রতিটি কক্ষ ও বারান্দার ছাদ অর্ধনলাকৃতির (ঢেউয়ের মত) করে নির্মিত হলেও উপরিভাগ লোহার তীর-বর্গা সংবলিত সমতল ছাদে আচ্ছাদিত এবং ছাদপ্রান্ত রেলিং বিশিষ্ট বপ্র (balustrated parapet) দ্বারা পরিবেষ্টিত। বপ্রটি কিছুদূর পর পর একটি করে চূড়া দণ্ডে (ক্ষুদ্র চূড়াবিশিষ্ট) শোভিত। এক সময় বপ্রের উপরে মিনার্ভা অর্থাৎ রোমান পুরাণের জ্ঞান ও চারুশিল্পের দুটি ভাস্কর্য (গ্রিক পুরাণে এর নাম প্যালাস অ্যাথিনী) স্থাপিত ছিল। পরবর্তীতে একই আদলে আরো দুটি ভাস্কর্য হেমন্তকুমারী ছাত্রাবাসেও স্থাপিত হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এ চারটি ভাস্কর্যই অপসারিত হয় যার দুটি বরেন্দ্র জাদুঘরে এখনও বর্তমান। ইমারতটির প্রতিটি দরজা ও নীচতলার জানালাসমূহ ভেনিসীয় খড়খড়ি সংবলিত এবং দ্বিতলের জানালাগুলোর কতিপয় গ্লাস পাল্লায় আচ্ছাদিত। এছাড়া ভবনটির বহির্দেয়ালগাত্রে নীচতলার জানালা ও বারান্দার খিলানসমূহের উপর পলেস্তারা কর্তিত একটি টানা পাড়নকশা বিদ্যমান। সমগ্র ইমারতটি একটি সুউচ্চ বেদীর উপর স্থাপিত। ইমারতের বারান্দায় উঠার জন্য সম্মুখে নয়ধাপ বিশিষ্ট সুপ্রশস্ত একটি সোপান শ্রেণি রয়েছে। ভবনটির মেঝে সম্প্রতি মার্বেল পাথর দ্বারা সুদৃশ্য পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে। দ্বিতলে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের কক্ষ সংলগ্ন পূর্ব দেয়ালে একটি করে এবং শিক্ষক মিলনায়তনের দক্ষিণ দেয়ালে একটি ও সভাকক্ষের পশ্চিম দেয়ালে একটি করে টয়লেট রয়েছে। অনুরূপভাবে নীচতলায় পশ্চিম দেয়ালে একটি ও সিঁড়িঘর সংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্বকোণে একটি টয়লেট রয়েছে। সুদৃশ্য ইমারতটি ঔপনিবেশিক আমলের এক অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপত্যকীর্তি হিসেবে বিবেচিত।

আরো দেখুন